তবু বর্ষা এলে…

বাইরে অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে, বারান্দায় দাঁড়িয়ে উদ্দাম বৃষ্টিকে দেখছি। পাশের যে গাছটা ছিল সেটাকে কারা যেন কমাস আগে নির্মমভাবে ডালপালা কেটে দিয়েছিল। আজ দেখি তার মধ্যেই অসংখ্য সবুজ পাতার আনাগোনা, ভীষন জীবন্ত, প্রাণোচ্ছল দেখাচ্ছে গাছটাকে। এটাই বর্ষার মাহাত্ম্য। নিস্তেজতা কাটিয়ে ভীষণভাবে বেঁচে থাকার ইচ্ছে জাগায়।

খুব ভিজতে ইচ্ছে করছে। দোতলা থেকে নীচে নামার সময় যদি কেয়ারটেকার দেখে ফেলে! ভাবতে ভাবতেই একটা বুদ্ধি এল মাথায়, গম্ভীরভাবে কেয়ারটেকারকে পাশ কাটিয়ে নিচে নেমে গেলাম, সাথে একটা প্যাকেটে মোড়া শুকনো হাউসকোট। নীচে নেমে চুপিচুপি ভিজলাম। ভেজা জামাকাপড়ের ওপর শুকনো হাউসকোট পরে নিয়ে আবার গম্ভীরভাবে ওপরে উঠে এলাম। কী আনন্দ যে হল!

অনেক দিন পর ভিজলাম এভাবে! বড় হয়ে যাওয়ার পড় এই ধরনের সুযোগ প্রায় আসেনা বললেই চলে, কিন্তু আমরা ছোটবেলায় কত সহজেই না নিজেদের ইচ্ছেগুলো পূরণ করতাম।

আমার মনে আছে ছোটবেলায় টানা বৃষ্টি পড়লে আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তায় জল জমত, ছোট ছোট কাগজের নৌকো বানিয়ে জলে ওই জমা জলে ভাসিয়ে দেওয়া ছিল একটা খুব প্রিয় খেলা। সেই নৌকোগুলোর কোন নির্দিষ্ট গন্তব্যস্থল ছিল না। উদ্দেশ্যহীনভাবে তারা এমনি ভেসে বেড়াতো। কখনও এপাশ-ওপাশ করতে করতে এক সময় আর এগোতে না পেরে উল্টে যেত। কিন্তু তাতেও কোন রকম খারাপ লাগা ছিল না। বরং আরো দ্বিগুন উৎসাহে আরো অসংখ্য নৌকো ভাসিয়ে দিতাম।

এখন ভাবি তখন কী ভাবতাম? তখন কি ভাবতাম যে এই উদ্দেশ্যহীন কাগজের নৌকো ভেসে যাক ততদূর; যেখানে আমার কল্পনাও পৌছোতে পারবে না। দূর-দিগন্ত পেরিয়ে দিগ্‌বিদিকশূন্য হয়ে অনির্দিষ্ট কাল শুধু ভেসে বেড়াবে। সীমানাহীন, উদ্দাম, উত্তাল। বাঁধন ছাড়া।

ঠিক কী ভাবতাম তখন?

তখন তো ঘাসফুলে ঘুরে বেড়ানো ফড়িং ধরতে খুব ভালো লাগতো, মাটিতে গড়াগড়ি খেতে ভালো লাগতো, কৃষ্ণচূড়া লাল রঙ মাখা বিরাট মাঠে উদ্দেশ্যহীন হাঁটতে খুব ভালো লাগতো, দূরের বন পাহাড় থেকে উড়ে আসতো বুনো টিয়ার ঝাঁক, একটা হলুদ গুলমোহরের গাছের তলায় দাঁড়িতে থাকতাম সেই অপেক্ষায় কখন গাছ থেকে গুলমোহর হাওয়ার ঝাপটে মাথার ওপর ঝরে পড়বে। সেই যে আনন্দ; সেটাই ছিল বোধহয় ঐশ্বরিক সুখ।

সেই ভাবনাগুলোর স্মৃতি সব আজ বড়ই আবছা, তবু বর্ষা এলে ওরা মনে পরশ দিয়ে যায়…

Advertisements

নিয়মতন্ত্রে বিশ্বাস-অবিশ্বাস

সমাজ কথাটা জড় বস্তুর মত শোনালেও, মানুষই এর ধারক এবং বাহক আর সেই কারনেই হয়তো এই ব্যবস্থার নিয়ম কানুনগুলো ছায়ার মত সবসময় আমাদের পেছনে পেছনে থাকে। একটু বেচাল হয়েছো কি তোমার ওপর ঝাপিয়ে পড়বে।আমাদের এই সমাজব্যবস্থা খুব সুন্দর, ভালো তা তো বলা যায় না।

এমন অনেকে আছেন যারা বাইরে প্রগতিশীলতার কথা বললেও ভেতরে ভেতরে ভীষণভাবে অন্ধ, যাকে বলা যায় নিয়মতান্ত্রিক সংস্কারে বিশ্বাসী। নিয়মতান্ত্রিক সংস্কারপন্থী বলে আমি তাদের বলছি যারা তার নিজের ধর্ম সম্মন্ধে যে সামান্য জ্ঞানটুকু রাখা প্রয়োজন তার কিছুই জানেন না, শুধু মাত্র কিছু অযৌক্তিক নিয়ম-সংস্কার মেনে চলেন আর অপরকেও সেগুলো মানতে বাধ্য করেন।

এদের মধ্যে ধার্মিক, অধার্মিক, হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, কমিউনিস্ট সকলেই আছেন। এরা নিজেদের ধর্ম বা বিশ্বাসে ঠিকমত বিশ্বাসও করেন না— কারণ তারা ঐশ্বরিক চিন্তা থেকে দূরে থাকেন, বেদ-কোরাণ-ক্যাপিটাল অথবা কোনও ধর্মগ্রন্থের চিন্তাকে ভাবার চেষ্টা করে দেখেননি, উৎসবে অথবা মিলাদের সময়ে পুরুত-মোল্লা-বড় কমরেডের নিয়ম ব্যাখ্যাতেই তারা সন্তুষ্ট। বই পড়েন না, পড়ার ইচ্ছে নেই। ইতিহাস জানেন না, জানার ইচ্ছে নেই। যদিও নিজকল্পিত ‘ধর্ম’ নিয়ে হুজুগে এরাই মাতেন সবচেয়ে বেশি। ইচ্ছে না হলেও যাবতীয় নিয়ম তোমার ঘাড়ে চাপিয়ে দেবেন, হিংস্র হয়ে উঠবেন— এমনই এই নিয়মতান্ত্রিক সংস্কারে বিশ্বাসীরা। এরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকারক—কারণ এরা কোন যুক্তি মানেন না। এরাই সংখ্যাগুরু।

আমার দেখা একটি ঘটনার কথা বলি।

একদিন একটি ছেলের মা মারা যায়। ছেলেটি একটি এনজিও’তে কাজ করে, গ্রামে-গঞ্জে পড়ে থাকে, কিছু অর্থে যুক্তিবাদি, খানিকটা সংস্কারমুক্ত। তা মা মারা যাওয়ার পড়ে ওর বাড়ীতে হুলুস্থুলু পড়ে গিয়েছিল; কারণ তার প্রতিবাদী সত্তা বলে উঠেছিল যে সে কোনওরকম হিঁদু নিয়ম কানুন পালন করবে না। সেই সময় তার আত্মীয়স্বজন, আর বিশেষ করে তার বোন বেশ হিংস্র হয়ে উঠেছিল। বলেছিল সে হিন্দু সংস্কারে বিশ্বাসী নাই হতে পারে কিন্তু তার মা তো বিশ্বাসী ছিলেন, অতএব তাকে নিয়ম পালন করতেই হবে। না হলে তার মায়ের আত্মার শান্তি হবে না। সেই ছেলেটি প্রতিবাদ করতে পারেনি কারণ সে এতটাই শোকাহত ছিল। তার মনে হয়েছিল এদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গেলে যে পরিমান এফোর্ট দিতে হবে সেই মুহূর্তে তার পক্ষে তা সম্ভব নয়। নিয়মতান্ত্রিক সংস্কারবোধ যুক্তির পরোয়া করেনি— মৃত ব্যক্তির শরীর ভস্মীভূত হয়ে গেছে; যে বেঁচে আছে তার মূল্যবোধকে অন্ততপক্ষে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

আর একজনের জীবনে ঘটনাটি একটু অন্য। সে তার মায়ের মৃত্যুর পর কোন রকম নিয়ম কানুন পালন করেনি। কিন্তু তার মা মৃত্যুর আগে পাড়া-প্রতিবেশিদের বলে গেছিলেন যে তার ছেলে কোন রকম নিয়ম পালন করবেন না তিনি জানেন; কিন্তু পাড়া-প্রতিবেশী যেন তাঁর মৃত্যুর পর হিঁদু নিয়ম যেন পালন করে ইত্যাদি। অন্য কোন আসুবিধায় সাহায্য না করলেও, সেই পাড়া-প্রতিবেশি সেদিন চাঁদা তুলে হিঁদুয়ানির সংস্কার পালন (পড়ুন, মৃত্যুকে উপলক্ষ্য করে কুৎসিত ভোজ) করতে এগিয়ে এসেছিলো ।

তবুও কিছু পুরুষরা এই সব নিয়মতান্ত্রিক সংস্কারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পেরেছেন। কিন্তু যে মেয়েরা চেষ্টা করেছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে ঘটনা যে আরো করুণ পরিণতির দিকে গিয়েছে, সেটা খুব কষ্ট করে কল্পনা করতে লাগে না।

একটি মেয়ে সে যদি কোন হিন্দু মধ্যবিত্ত পরিবারে বিয়ের পর সিঁদুর বা শাখা-পলা কিছু না পরে তাহলে তাকে যে তার শ্বশুরবাড়ি, রাস্তাঘাট, কাজের ক্ষেত্রে কত বার যে কিছু অর্থহীন প্রশ্নের বা মন্তব্যের সম্মুখীন হতে হয়— সে সিঁদুর কেন পরে না? তাকে তো দেখে বোঝাই যায় না যে সে বিবাহিত, ইত্যাদি। তার পক্ষে কিভাবে সম্ভব জনে জনে বলে বেড়ানো সম্ভব, নাকি নিজের গায়ে একটা পোস্টার এঁটে ঘুরে বেড়িয়ে জানানো— ওরে, সিঁদুর কনসেপ্টটা এসেছে সম্পত্তির ভাবনা থেকে! প্রাগৈতিহাসিক গোষ্টিসমাজের নিয়ম থেকে এটা এসেছে রে, যেখানে বল্লম দিয়ে কপাল চিরে পুরুষ তার সোনা-দানা, জমি-বাড়ীর, গরু বাছুরের মত নিজের ‘স্ত্রীধন’কেও চিহ্নিত করতো।

এই অশিক্ষা আর নিয়মতান্ত্রিক সংস্কারের অন্ধকারের মাঝখানেই আমরা বাস করি। নিয়মতান্ত্রিক সংস্কারের পক্ষের মানুষজনকে ‘শিক্ষিত’ বলতে আমার আপত্তি আছে- এরা অক্ষর চিনতে সক্ষম হলেও অক্ষরের ভেতরের মর্মার্থকে আজও বুঝতে শেখেনি, অক্ষর ও মানুষের মনের স্বাধীন ইচ্ছে আর কল্পনা নিয়ে এরা ভাবিত নয়। দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কাঠমোল্লাদের থেকেও গোঁড়া এই অশিক্ষিত, ক্ষতিকারকভাবে রক্ষণশীল, আর নিয়মতান্ত্রিক সংস্কারপন্থী শ্রেণিকে বোঝানোর মত খুব দুঃসাধ্য কাজ আর কি থাকতে পারে! তবু মন স্বাধীন, কল্পনা স্বাধীন এটাই বাঁচোয়া…

– মেঘা

২৩শে জুলাই, ২০০৯

[ কোনও অজ্ঞাত কারণে দেখছি ব্লগে পোস্ট করার পর তারিখটি এক মাস আগের দেখাচ্ছে।

ওয়ার্ডপ্রেসের এ আজব টাইম মেশিন! ]

আবার নতুন করে…

প্রত্যেক লেখার ক্ষেত্রে একটা দায়বদ্ধতা থাকে নিজের কাছে এবং পাঠকের কাছে। আমারও আছে। বিশেষ করে যখন আমি অনেক দিন না লিখলে তারা জিজ্ঞেস করেন কেন আমি দীর্ঘ দিন লিখছি না। সেই প্রশ্ন বা দায়বদ্ধতা বলবো না; আমার নিজের ভেতর জমতে থাকা কথাগুলো বলতে চাইছি। আর এই একটি ক্ষেত্র যেটা সম্পূর্ণ আমার। এখানে বহুদিন লিখি না তাতে খারাপ তো লাগছিলই। কিন্তু গুছিয়ে উঠতে পারছিলাম না।

অনেক দিন পর লিখতে বসেছি, জানি না শব্দগুলোকে কতটা গোছাতে পারবো!

এই কয়েক মাস আমি এমন একটা সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলাম যখন আমি ভীষণ অসুস্থ, দীর্ঘ অসুস্থতার কারনে কোনকিছুই ভালো লাগছিলো না। সেই সময় মনে হত যে এই যন্ত্রণা থেকে কি মৃত্যুও ভালো? নিজেকে বারে বারে প্রশ্ন করেছি; নাকি মৃত্যুর যন্ত্রণা আরো ভয়ানক!

এখনো কেমন একটা আতঙ্কে কাটাই, যন্ত্রণার দিনগুলো আবার যদি ফিরে ফিরে আসে?। হয়তো আমি আর সহ্য করতে পারবো না। সুস্থ ভাবে বেঁচে থাকার কি প্রবল ইচ্ছে!

শারীরিক ভাবে অসুস্থ থাকার ফলে আমি মানসিকভাবেও খুব ভেঙে পড়েছিলাম। কোনওকিছু করতেই ইচ্ছে করতো না। আর যখন সুস্থ হলাম; ঠিক তার পরেই কাজের মধ্যে এমনভাবে ঢুকে পড়লাম যে নিজের লেখার জন্য সময় বার করা হয়ে উঠছিল না।

এখন ভাবি একটা সময় এই আমিই চাইতাম যেন আমাকে প্রচন্ড ব্যস্ততা ঘিরে ফেলে; যে নিজের জন্য ভাববার আর কোন সময় না থাকে।

সব বাঁধা কাটিয়ে উঠেছি বলবো না, ইচ্ছেগুলো আবার বাঁধন পেরোতে চাইছে, প্রচন্ড বর্ষায় প্রবল ভাবে ভিজতে চাইছে, এখন তো আমারই সময়!

ওরা

সেদিনের কথা আজও ভুলতে পারেনি। নীল নদীতে গা ভাসিয়ে দিয়েছিল, সেদিন কমিউন করে সারারাত কাটিয়েছিল ওরা।

গ্রামের কেউ ওদেরকে খেতেও দেয়নি। বরং বেশ ভয় পেয়েছিল। শেষ রাতে পরিত্যক্ত এক মাটির দেওয়ালের ঘরে শুয়ে হয়ত প্রত্যেকের মনে হয়েছিল, শরীরের প্রত্যেকটা শিরা-উপশিরা দিয়ে ঠান্ডা যেন সমস্ত দেহটাকে অবশ করে দেবে; রক্ত জমাট বেঁধে যাবে। ওরা সারারাত জেগে ছিলো। ঘুম আসেনি সারারাত…

যখন সন্ধ্যেবেলায় হ্যারিকেনের আলোয় খালি গলায় চেঁচিয়ে মিটিং হচ্ছিল, ওদের কথাগুলো সবাই শুনছিল মন দিয়ে। গাছের তলায় জমায়েত হয়েছিল সেদিন।

ওরা হয়তো স্বপ্নও দেখছিল, প্রচন্ড দৃঢ় চোখগুলি ভেসে গিয়েছিল কোন এক কল্পনার দেশে

সেদিন রাতে আগুন জ্বলেনি ওদের ঘরে। শীতে আগুনের গরম তাপ ওদের কাছে পৌছোয়নি। তবুও ওদের দুচোখ পূর্ণ ছিল নতুন এক পৃথিবীর কল্পনায়। নতুন এক পৃথিবী! সেদিন ওদের কানের কাছে কে যেন বারে বারে বলে দিচ্ছিল

আশ্চর্য ভাতের গন্ধ রাত্রির আকাশে

কারা যেন আজও ভাত রাঁধে

ভাত বাড়ে, ভাত খায়।

আর, আমরা সারা রাত জেগে থাকি

আশ্চর্য ভাতের গন্ধে

প্রার্থনায়, সারা রাত।

“সটীক জাদুনগর”

সম্প্রতি সটীক জাদুনগর (২০০৮) বইয়ের উপন্যাস তিনটে পড়ছিলাম। লেখক রাঘব বন্দ্যোপাধ্যায়, সাংবাদিকতা থেকে অবসর নেওয়ার পর ভদ্রলোক চর্চাপদ বলে একটি ছোট্ট প্রকাশনী খুলে নিজের বেশ কিছু নতুন-পুরোনো লেখা ছাপছেন। বেশ ভাল প্রাপ্তি। অন্য স্বাদের, প্রচন্ড সচেতন ভাষার ব্যবহারে যত্নে লেখা, মেনস্ট্রিম বাংলা সাহিত্য থেকে অনেকটাই আলাদা।

তিনটে উপন্যাসই পুরোনো কলকাতা-ঘেরা স্মৃতি, মূল্যবোধ, আর নস্টালজিয়ার যোগসূত্রে গাঁথা। সাম্প্রতিক কালের ইতিহাসবোধের অভাব নিয়ে ভাবিত রাঘববাবু, কিন্তু অনেক মানুষের মতো দিশেহারা বোধ করেন না। বরং নতুন আঙ্গিকে বুঝতে চান এই অদ্ভুত সমকালকে।

কয়েকটা শব্দ এত নাড়া দিল; মনে হল যেন একদম আমার মনের কথা। বইটির ভূমিকায় রাঘব বন্দোপাধ্যায় লিখছেনঃ

সময়ের চাপ এড়াতে, ফাঁকা-ফাঁকা লাগার, অর্থহীনতার একটা তীব্র বোধ এড়াতে- নিজেকে সুস্থ রাখতেই এই লেখার পরিকল্পনা! যা একদিন ঘুম থেকে উঠে অনুভব করি, লিখি না কেন নিজের জন্য, যা প্রাণে চায়! না-হয়, নাই ছাপালাম, ছাপিয়ে লাভ নেই কিছু, কেননা এই লেখা আমাকে লেখক করবে না! কিন্তু ক্ষতিও তো নেই, না আমার , না অন্যের, … সুস্থ থাকার একটা চেষ্টা, নিজেকে ফিরে পাওয়া, তন্নতন্ন করে দেখা!


ব্যস্ততার সন্ধান

বেশ কিছুদিন এ শহরে ছিলাম না। গিয়েছিলাম উত্তরে, আমার সেই ছোটবেলার মফস্বলের শহরে। ওই শহরে যতবার যাই ততবার মন খারাপ হয়ে যায় কিন্তু তবুও যাই। ওই শহর থেকে আমার আর নেওয়ার কিছু না থাকলেও যে পিছুটানগুলো আছে সেগুলো ছেড়ে আজও বেরোতে পারিনি। সেই কারনেই যাই। মন খারাপ নিয়ে আবার ফিরে আসি।

আমার জীবনে এখন ব্যস্ততার বড় অভাব। এখন আমি ভীষণ ব্যস্ত হতে চাই, এতটাই ব্যস্ত যে আমার মনখারাপের জন্য যেন কোনও সময় না থাকে। আর এই শহরে আছে সেই ব্যস্ততা। বাড়ি থেকে বেরোনোর পর চারপাশে শুধু দেখি ব্যস্ত মানুষের ভিড়। এই শহরে সবাই এতটাই ব্যস্ত যে কারও দিকে তাকানোর সময় নেই। এই কলকাতা শহরটাকে যতই গালাগালি দিই না কেন, এই শহরটা ব্যস্ততার মধ্যে ডুবিয়ে দিয়ে সব খারাপ-লাগাকে ভুলিয়ে দিতে জানে।

ট্রেনে করে ফিরতে গিয়ে দেখলাম ভোরের ব্যস্ত কলকাতাকে। শিয়ালদা স্টেশনে আধো-ঘুম চোখে ব্যস্ত কিছু মানুষের ভিড়। এই সকালের ব্যস্ততা সেই সব মানুষদের বেশি যারা, শহরের বাজারে সব্জি যোগান দিতে চলেছে। দল বেঁধে গ্রামগঞ্জ উজাড় করে মহিলার দল শহরের বাবুদের ঘরে কাজ করতে ছুটছে, ঠিকে মজুরের কাজ খুঁজতে ভোর রাতে গ্রামের ছোট্ট রেলস্টেশন থেকে শহরে ছিটকে এসে জটলা করছে অসংখ্য যুবক, প্রৌঢ় মানুষও কিছু আছেন তাঁদের মধ্যে। রাতভোর প্ল্যাটফর্মে কাটানো ঘুমন্ত বাস্তুহারা মানুষজন এর মধ্যে উঠে পড়ে কোথাও দিনমানের জন্য অদৃশ্য হয়েছে, রাতে আবার আশ্রয়ের অভাবে এইখানেই ফিরে আসবে হয়ত।

আর এই ছুটে চলা দৃশ্য ও অদৃশ্যের ফাঁকে-ফাঁকে আমাদের মত কিছু মেল ট্রেনের যাত্রিরা রয়েছে যারা তাঁদের সদ্য ছেড়ে আসা মফস্বল শহরটাকে এর সাথে মেলানোর চেষ্টা করছে, পারছে না। এই ব্যস্ততার অবশ্য আরেকটি দিকও আছে। এখানকার সবকিছুকেই বড় নির্দয়, যান্ত্রিক বলে মনে হয়। এই যে ভিড়, এর যাবতীয় কোলাহলের মধ্যে ফেলে আসা মফস্বল শহর যেন একটু একটু করে সরে যেতে যেতে ক্রমশ হারিয়ে যেতে শুরু করে। ছুটে চলা জীবনের স্রোত সব কিছুকে গ্রাস করে ফেলে। আমিও জনসমুদ্রে মিলিয়ে যাই, ডুবে যাই মানুষের ভিড়ে, মিশে যাই ব্যস্ততার বলয়ে, যেখানে ভিড়ের মধ্যে প্রত্যেকটি মানুষ একাকিত্বে ভোগে।

এবার ধাতস্থ হতে অনেক সময় লাগবে আমার, একথাটা ভাবতে ভাবতেই ঘরে ঢুকলাম। দেখি সারা ঘর ধুলোয় ভরা, টবের গাছগুলি মৃতপ্রায়। নিজের উপরই প্রচন্ড রাগ হল, কেন যাই এই শহর ছেড়ে, ফিরে আসি শুধু মন খারাপ নিয়ে। এখানেই যখন থাকতে হবে তখন বারে বারে যাই কেন? উত্তর জানা নেই!

দমবন্ধ করা ঘরের জানালা খুলতে গিয়ে ভাবলাম, সেই যে দোতলা-ছোঁয়া নিমগাছটি আমার ঘরের জানালা দিয়ে দেখা যেত, সেটা কেমন আছে?

আগাছার মতো আবাসন উঠছে এই পাড়ায়, ওই একটিই এখনও অব্দি অবশিষ্ট গাছেদের মধ্যে। বেঁচে আছে বললে ভুল বলা হবে, বলা যায় মাটি কামড়ে পড়ে আছে জীবনের ইচ্ছেটাকে ধরে রেখে। বা এখনও তাকে কেটে ফেলা হয়নি এই যা। একদিন তো দেখি কয়েকজন গাছটার গোড়ার কাছে খুঁড়ে, বেশ কিছু শেকড় কেটে দেওয়ালের সীমারেখা তৈরি করছে। গাছটিকে যাওয়ার দিন অব্দি দেখেছি ভীষন রুক্ষ, সবকটা পাতা ঝরে পড়েছে, গোটা গাছটা কেমন প্রেতাত্মার মতো অতীতের কিছু স্মৃতি ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আর আজ অনেকদিন পর ফিরে এসে জানালা খুলে দেখি গোটা গাছ সবুজ পাতায় ভরে গেছে, সেই রুক্ষতা কোথায় হারিয়ে গিয়ে সম্পূর্ণ সজীব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ছোট সাদা ফুল আর কচি সবুজ পাতাদের নিয়ে সে আবার প্রচন্ড ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। দেখে মন খুশিতে ভরে গেল।

সেই সব জ্ঞানদাতারা

এমন কিছু মানুষ আছে যারা জ্ঞান দিতে খুব ভালবাসে।

যারা জীবনে যতটুকু পড়েছে সে সব কিছুকে অন্য কাউকে জ্ঞান-আকারে না বলতে পারলে ভালো লাগে না। কারণ তারা এটা দিতে ভালবাসে শুধু নয় তাদের একটু সুযোগ করে দিলে কি দিলে না,  কখনোই সেই সুযোগকে হাতছাড়া করবে না। জ্ঞানের ভান্ডার উপুড় হয়ে পড়বেই পড়বে।

 

জ্ঞান জিনিসটা বড় অদ্ভুত। এটা আপনারা ফ্রি-তে পাবেন, কোন টাকা লাগবে না।

 

পথে ঘাটে যখন তখন তো পাবেনই, সবচেয়ে বেশি পাবেন ইউনিভারসিটি চত্বরে। কিছু দাদা-স্থানীয় মহান ব্যক্তিরা আছেন যারা এই জ্ঞানদান করতে সবসময়ই প্রস্তুত। যারা নিজেদের  জীবনে কোন অবস্থাতেই খুশি নয়। যাদের কোন পরিশ্রম জাতীয় কাজ করতে একদম ভালো লাগে না। তারা বসে বসে শুধু বাত্তেলা মারতে খুব ভালবাসে। তাদের ভাবটা এমন যেন এই অমুল্য জ্ঞান দান করে তারা এত উপকার করছে যার কোন তুলনাই হয় না। এতেই সমগ্র মানব জাতির উন্নতি লুকিয়ে আছে।

 

অনেকদিন পর ভার্সিটি গিয়ে এদেরই একজনের সাক্ষাৎ পেয়ে, কারণছাড়া ভরপেট জ্ঞান শুনে, আজকে খুব চেনা একটি কবিতার কথা মনে পড়ে গেল। কবিতাটি সুকুমার রায়ের, ছোটবেলায় পড়েছিলাম।

 

 

জীবনের হিসাব

 

বিদ্যেবোঝাই বাবুমশাই চড়ি সখের বোটে

মাঝিরে কন, বল্‌তে পারিস্‌ সূর্যি কেন ওঠে?

চাঁদটা কেন বাড়ে কমে? জোয়ার কেন আসে?

বৃদ্ধ মাঝি অবাক হয়ে ফ্যাল্‌ফেলিয়ে হাসে।

বাবু বলেন, সারা জনম মর্‌লিরে তুই খাটি,

জ্ঞান বিনা তোর জীবনটা যে চারি আনাই মাটি!’’

 

খানিক বাদে কহেন বাবু বল্‌ত দেখি ভেবে

নদীর ধারা কেম্‌নে আসে পাহাড় হতে নেবে?

বল্‌ত কেন লবণপোরা সাগরভরা পানি?

মাঝি সে কয়, আরে মশাই অত কি আর জানি?

বাবু বলেন, এই বয়সে জানিসনেও তাকি?

জীবনটা তোর নেহাৎ খেলো, অষ্ট আনাই ফাঁকি।

 

আবার ভেবে কহেন বাবু বল্‌তো ওরে বুড়ো,

কেন এমন নীল দেখা যায় আকাশের ঐ চুড়ো?

বল্‌তো দেখি সূর্য চাঁদে গ্রহণ লাগে কেন ?

বৃদ্ধ বলেন, আমায় কেন লজ্জা দেছেন হেন?

বাবু বলেন, বল্‌ব কি আর, বল্‌ব তোরে কি তা,

দেখ্‌ছি এখন জীবনটা তোর বারো আনাই বৃথা।

 

খানিক বাদে ঝড় উঠেছে ঢেউ উঠেছে ফুলে,

বাবু দেখেন নৌকাখানি ডুব্‌ল বুঝি দুলে।

মাঝিরে কন, একি আপদ! ওরে ও ভাই মাঝি,

ডুব্‌ল নাকি নৌকা এবার? মরব নাকি আজি ?

মাঝি শুধায়, সাঁতার জানো? মাথা নাড়েন বাবু,

মুর্খ মাঝি বলে, মশাই, এখন কেন কাবু,

বাঁচলে শেষে আমার কথা হিসেব করো পিছে,

তোমার দেখি জীবনখানা ষোল আনাই মিছে।

                                             

[ সত্যজিৎ রায় ও পার্থ বসু সম্পাঃ, সমগ্র শিশুসাহিত্য, সুকুমার রায়, আনন্দ পাবলিশার্স প্রকাশিত, ১৩৮৩, পৃঃ ১৬ থেকে। সুকুমার রায়ের আর সব লেখাগুলো ফের পড়তে ইচ্ছে করলে, এই সাইটটা দেখুন ]

ধারাবাহিকতা

আমি কোনও কিছু শুরু যেমন করি, আবার শেষও করে ফেলি খুব সহজে। ধারাবাহিকতা থাকে না। কত সহজে বললাম কথাটা! এখন যেমন লিখতে বসেছি কিন্তু কি লিখবো বুঝে উঠতে পারছি না। অনেক দিন তো না লিখে কাটিয়ে দিলাম। আজকে একটু লেখার ইচ্ছে হল কিন্তু সাজাতে পারছি না। অনেকদিন পর যেহেতু লিখছি, সেই কারনেই হয়তো লেখার ধারাবাহিকতাও ফিরে আসছে না।

 

ধারাবাহিকতা, কী অদ্ভূত একটা শব্দ!

 

আর আমার জীবনে এটারই বড় অভাব, শব্দটা নিয়ে নানাভাবে নাড়াচাড়া করেও, লেখাতে ধারাবাহিকতা বজায় রাখাটাই কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। ছোটবেলায় আমার এক মাষ্টারমশাই একটা কথা বলে ছিলেন, ঝট্করে মনে পড়ে গেল। আমাদের মাথাটাকে যদি আমরা ব্যবহার না করি তাহলে তাতে জং পড়ে যায়। কথাটা এখন মর্মেমর্মে উপলব্ধি করছি। অব্যাবহারে অনুভূতিও কেমন ভোঁতা হয়ে যায়। বুঝতে পারি, ভালো কিছু নাপড়াটা অসুস্থতা।

 

ভালো কিছু পড়া উচিত। ভাল কিছু লেখা উচিত। অন্তত চেষ্টা করা উচিত। জানি এই সিদ্ধান্তগুলো আমরা সকলে প্রত্যেকবার ভাঙি; আবার নতুন করে তৈরি করি। তবুও আরেকবার

 

সেই দূরত্ব সঞ্চয় করেছি মাত্র

সেদিনই উঠেছিলাম পাহাড়ে; সব নিয়ম মেনে, সমস্ত কিছুকে অনুভব করতে করতে। কিন্তু পাহাড় খুব জটিল। তার প্রত্যেকটা খাঁজ যদি ঠিক ভাবে না ধরে ওঠো তাহলে তুমি আহত হতে বাধ্য। সহজে তার কাছে পৌছনো সম্ভব নয়। সে তার মত করে একটা নিয়ম তৈরি করে রেখেছে। সেই নিয়ম না ভাঙ্গাটাই ভাল। আর পাহাড়ী কাঁটাঝোপও জানে আমরা এখানে নতুন, তাই বুঝি তার কাঁটা হাতে পায়ে ফুটে জানান দেয়, সামলে চল্‌

গিয়েছিলাম বেড়াবো বলে, রকক্লাইম্বিং বিষয়টা কীরকম হবে তার কোনও স্পষ্ট ধারণা না নিয়েই। ফলে গিয়ে ভালো লাগিয়েছি অনেককিছু, ঠকেছিও অনেকটা। কর্তা-ব্যক্তি যারা গিয়েছিলেন এই নিয়ম মেনে পাহাড়ে চড়া সম্ভব করতে, তাঁরা এতটাই হিসেবি যে তাদের জন্য পাহাড়ে চড়েও চোখ বন্ধ করে কল্পনার জগতে ঢুকতে পারি নি। একটু জিরোতে বসেছি, অমনি ধমক- বসে কেন, গিঁট প্র্যাকটিস করো।কানের কাছে ক্রমাগত চিৎকার শুনতে শুনতে এমন অবস্থা হয়েছে যে ফুলঝাড়ু নেবে বলে কেউ গলিতে হাঁক দিলেও টেক দ্য স্ল্যাগ শুনতে পাচ্ছি স্পষ্ট।

দিনের আলো না ফুটতেই উঠে পড়ে দৌড়, তারপর হাড়মুড়মুড়ে এক্সসারসাইজ, কোনওমতে সকালের খাবার খেয়ে পাহাড়ের খাঁজ ধরে চড়া। পাহাড় থেকে নেমে দুপুরের খাবার খাওয়া, তারপর সন্ধ্যা গড়ানোর আগেই আবার বেস ক্যাম্পে ফেরা। বিকেলে ঢুলু-ঢুলু চোখে ক্লাস— এইটে হলো বরফ-কুঠার, ওইটে হলো জুমার, ক্যারাবিনোতে কী করে নিজেকে পেঁচাতে হয় দেখে নাও, দড়ি কমিটার লম্বা হয় ও কী-কী প্রকার লিখে নাও, পাথরে চড়ার অষ্টম মার্গ ও সোনালী নিয়ম কী ও কেন, ইত্যাদি।

ভোর থেকে রাত এতরকম অদ্ভূত নিয়মের মধ্যে সব কিছুকে বেঁধে রাখার চেষ্টা যে খানিকটা দমবন্ধই লাগছিল। শেষের দিন আবার লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা! সময় বেঁধে দেওয়া, এই সময় তুমি তাবু খাটানো প্র্যাকটিস করো রে, ওই সময় তুমি যথেচ্ছ কেরোসিন-ঢালা ক্যাম্পফায়ারে গান গেয়ে আনন্দ করো রে। এসবের মধ্যে কোথায় যেন ভীষন সাজানো একটা ব্যাপার। ইচ্ছে না থাকলেও বাধ্যতামূলক।

তবে এর মধ্যেও অন্যরকম হল পাহাড়ের কাছাকাছি থাকার অনুভূতি। ভোরবেলা গোটা ক্যাম্প যখন ঘুমোচ্ছে, তখন পাহাড়ে উঠে গিয়ে এমন কয়েকটা মুহূর্ত সঞ্চয় করেছি যার জন্য সব কিছু মেনে নেওয়া যায়। ভোরবেলার দিকে তখন একটা অদ্ভুত দমকা হাওয়া, যার সজীবতা শরীরের প্রত্যেকটা অনু-পরমাণু-শিরা-উপশিরা দিয়ে অনুভব করা যায়।

সেই দমকা হাওয়াকে ভালবেসেছি, সেই রাতের তারা ভর্তি আকাশটিকে ভালবেসেছি। আর সেই একা পাহাড়টিকেও যার খাঁজে বসলে দূরের সেই গ্রামটিকে দেখা যায় কিন্তু যার কাছে যাওয়া যায় না। এটাই তো ভাল, কাছে যাওয়া যাবে না, ছোঁয়া যাবে না, দূর থেকেই তাকে অনুভব করতে হবে। আমার স্বপ্নের সেই গ্রামের কথা মনে করিয়ে দেয় যার শুধু ভালদিকটাই আছে কোন খারাপদিক নেই।

যাবতীয় নিয়মের মধ্যে থেকেই সেই দূরত্বের, সেই পাহাড়কে সঞ্চয় করে নিয়ে এসেছি এই শহরে। স্মৃতিগুলো যতদিন না ম্লান হয় ততদিন …

সেই দূরত্ব সঞ্চয় করেছি মাত্র

সেই দূরত্ব সঞ্চয় করেছি মাত্র

এখনও সমতলের সকাল দেখিনি

অনেক দিন কিছু লিখি না। এই কদিন শারীরিক ক্লান্তিতে শব্দগুলো হারিয়ে গিয়েছিল, খুঁজে পাচ্ছিলাম না। শরীর জানান দিল শব্দগুলোকে ফিরে পেতে গেলে দীর্ঘ ঘুমের প্রয়োজন। একটু অপেক্ষা করতে হবে। তাই বেশ কয়েক দিনের ঘুমের পর আজকে উঠলাম। দেখি নতুন বছরের অনেকগুলো দিন কেটে গেছে। তবে জীবনের অনেক কিছু যে পালটে গেছে এমনটা তো নয়; সব কিছুই যে অবস্থাতে রেখে গেছিলাম সেই রকমই তো আছে। শুধু মাঝখান থেকে কয়েকটা দিন ফুরিয়ে গেছে, এই যা।

তবে কয়েকটা দিনের স্মৃতি একটু অন্যরকম। খারাপ-ভালো মিশিয়ে কাটলো কয়েকটা দিন।

কিছুটা শঙ্কা,কিছুটা অজানাকে জানার ইচ্ছে, সব মিলিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম।

ঝাড়খন্ড-সীমান্তবর্তী এলাকা, এক ফসলের দেশ। রাত-ভোর বাসে কাটিয়ে ওখানে পৌছে দেখি অনেকগুলো পাহাড় সপাট মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে, আর একটা নিরিবিলি পাহাড়ের নীচে একটু সমতল মত জায়গায় আমদের টেন্টগুলো পর-পর সাজানো।

এই কদিন কাজ হল পাহাড়ে ওঠা আর নামা। কখনও এত ক্লান্ত যে ওঠার ক্ষমতা নেই, কিন্তু উঠতে যে হবেই। ওঠার পর এক অদ্ভুত ভাললাগা। কখনও পাহাড়ের ওপর উঠে নীচের গ্রামগুলোকে দেখেছি তো কখনও একটা জল-টলটলে পুকুরের নিঃস্তব্ধতাকে অনুভব করছি। অনেক অনেক পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে, তাদের ঘিরে বন তুলসীর বন, আর আছে দিগন্ত বিস্তৃত নিঃস্তব্ধতা। এতজন ছিল কিন্তু কখনও মনে হয় নি যে এদের প্রত্যকের অস্তিত্ব এই নিস্তব্ধতাকে ভেদ করতে পারে।

চুপচাপ কোন এক পাহাড়ের উপর বসে থেকে ভেবেছি এভাবে যদি অনেকটা সময় বসে থাকতে পারতাম। ভোরের আলোর আগেই অসম্ভব ঠান্ডায় সেই বড় খাড়া পাহাড়টার নীচের দিকের আরেকটা পাহাড়ের টিলায় বসে থেকে শুধু দূরের জঙ্গলটাকে দেখেছি, ভোর চারটের সেই শিরশিরে ঠান্ডায় পাহাড়ের ঢালে বসে থেকেছি। অনেক দূরের ট্রেনের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম। ওখানে শুধু আমি আর আমার চারপাশে পাহাড় আর পাহাড়। মানুষের আওয়াজ নেই, গাড়ির শব্দ নেই, শুধু অন্তরঙ্গ নিঃস্তব্ধতা। এতটাই নিঃস্তব্ধ যে নিজের নিঃশ্বাসের শব্দ নিজেই শুনতে পাচ্ছি।

ওখানে সূর্য ওঠার অপেক্ষায় বসে থেকেছি। আজ যদি এই শহরে সূর্য নাও ওঠে তাহলেও কোনও আক্ষেপ থাকবে না। ওই আধো-অন্ধকার পাহাড়টাকে বড় বেশি ভালো লাগিয়ে ফেলেছি…