তবু বর্ষা এলে…

বাইরে অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে, বারান্দায় দাঁড়িয়ে উদ্দাম বৃষ্টিকে দেখছি। পাশের যে গাছটা ছিল সেটাকে কারা যেন কমাস আগে নির্মমভাবে ডালপালা কেটে দিয়েছিল। আজ দেখি তার মধ্যেই অসংখ্য সবুজ পাতার আনাগোনা, ভীষন জীবন্ত, প্রাণোচ্ছল দেখাচ্ছে গাছটাকে। এটাই বর্ষার মাহাত্ম্য। নিস্তেজতা কাটিয়ে ভীষণভাবে বেঁচে থাকার ইচ্ছে জাগায়।

খুব ভিজতে ইচ্ছে করছে। দোতলা থেকে নীচে নামার সময় যদি কেয়ারটেকার দেখে ফেলে! ভাবতে ভাবতেই একটা বুদ্ধি এল মাথায়, গম্ভীরভাবে কেয়ারটেকারকে পাশ কাটিয়ে নিচে নেমে গেলাম, সাথে একটা প্যাকেটে মোড়া শুকনো হাউসকোট। নীচে নেমে চুপিচুপি ভিজলাম। ভেজা জামাকাপড়ের ওপর শুকনো হাউসকোট পরে নিয়ে আবার গম্ভীরভাবে ওপরে উঠে এলাম। কী আনন্দ যে হল!

অনেক দিন পর ভিজলাম এভাবে! বড় হয়ে যাওয়ার পড় এই ধরনের সুযোগ প্রায় আসেনা বললেই চলে, কিন্তু আমরা ছোটবেলায় কত সহজেই না নিজেদের ইচ্ছেগুলো পূরণ করতাম।

আমার মনে আছে ছোটবেলায় টানা বৃষ্টি পড়লে আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তায় জল জমত, ছোট ছোট কাগজের নৌকো বানিয়ে জলে ওই জমা জলে ভাসিয়ে দেওয়া ছিল একটা খুব প্রিয় খেলা। সেই নৌকোগুলোর কোন নির্দিষ্ট গন্তব্যস্থল ছিল না। উদ্দেশ্যহীনভাবে তারা এমনি ভেসে বেড়াতো। কখনও এপাশ-ওপাশ করতে করতে এক সময় আর এগোতে না পেরে উল্টে যেত। কিন্তু তাতেও কোন রকম খারাপ লাগা ছিল না। বরং আরো দ্বিগুন উৎসাহে আরো অসংখ্য নৌকো ভাসিয়ে দিতাম।

এখন ভাবি তখন কী ভাবতাম? তখন কি ভাবতাম যে এই উদ্দেশ্যহীন কাগজের নৌকো ভেসে যাক ততদূর; যেখানে আমার কল্পনাও পৌছোতে পারবে না। দূর-দিগন্ত পেরিয়ে দিগ্‌বিদিকশূন্য হয়ে অনির্দিষ্ট কাল শুধু ভেসে বেড়াবে। সীমানাহীন, উদ্দাম, উত্তাল। বাঁধন ছাড়া।

ঠিক কী ভাবতাম তখন?

তখন তো ঘাসফুলে ঘুরে বেড়ানো ফড়িং ধরতে খুব ভালো লাগতো, মাটিতে গড়াগড়ি খেতে ভালো লাগতো, কৃষ্ণচূড়া লাল রঙ মাখা বিরাট মাঠে উদ্দেশ্যহীন হাঁটতে খুব ভালো লাগতো, দূরের বন পাহাড় থেকে উড়ে আসতো বুনো টিয়ার ঝাঁক, একটা হলুদ গুলমোহরের গাছের তলায় দাঁড়িতে থাকতাম সেই অপেক্ষায় কখন গাছ থেকে গুলমোহর হাওয়ার ঝাপটে মাথার ওপর ঝরে পড়বে। সেই যে আনন্দ; সেটাই ছিল বোধহয় ঐশ্বরিক সুখ।

সেই ভাবনাগুলোর স্মৃতি সব আজ বড়ই আবছা, তবু বর্ষা এলে ওরা মনে পরশ দিয়ে যায়…

2 comments so far

  1. Mahmud on

    ছেলেবেলার এইসব স্মৃতি আমাকেও যেন অনেক অনেক পেছনে নিয়ে চলে গিয়েছিল……
    আপু আপনার লেখার ধরণটা খুব সুন্দর… প্রকাশভঙ্গি অনেক সরল… এককথায় চমৎকার!
    এরকম বৃষ্টিভেজা লেখা আরো চাই। বর্ষা আমারো খুব প্রিয় কিনা! :-)

  2. বাপি বিশ্বাস on

    দিদি আবার আপনার লেখার স্বাদ পেলাম । এবার আমি বলবো না আপনি কেমন লিখেছেন । শুধু এটুকুই জানতে চাইবো আমার ঢ়ৈশবের কিছু স্মৃতিআপনি তুলে ধরলেন কিভাবে? মন দিয়ে কয়েকবার পড়েছি।পড়তে পড়তে ফিরে পেয়েছি ছেলেবেলাকে । নিয়মিত লিখবেন দিদি


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

Follow

Get every new post delivered to your Inbox.